সয়েল টেস্টিং ল্যাবে মাটির পিএইচ লেভেল মাপার নিয়ম
মাটির pH পরিমাপ কৃষি গবেষণার একটি সাধারণ প্রকল্প। মাটির pH মান শুধুমাত্র
মাটিতে পুষ্টির ফর্ম এবং প্রাপ্যতাই প্রতিফলিত করে না, এর সাথে এর ভৌত রাসায়নিক
ও জৈব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র
রেফারেন্সের জন্য, মাটির pH পরিমাপের জন্য একটি সর্বজনীন পদ্ধতি বর্ণনা করে
সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো অনুমান করে চুন, ছাই বা অন্য কোনো উপাদান প্রয়োগ না করে
মাটি পরীক্ষা করা এবং ফল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। সঠিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত
পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই কৃষিপদ্ধতির সমন্বয়েই মাটির
স্বাস্থ্য ও উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব।
পোস্ট সূচীপত্র ঃসয়েল টেস্টিং ল্যাবে মাটির পিএইচ লেভেল মাপার নিয়ম ঃ
- জল বা দ্রবণ দিয়ে মাটি পাতলা করুন
- মাটির pH পরিমাপ পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহের জন্য স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে
- পিএইচ পরিমাপঃ
- মাটির pH কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- মাটির pH কম হলে কী হতে পারে?
- মাটির pH বেশি হলে কী সমস্যা হয়?
- মাটির pH কীভাবে পরীক্ষা করবেন?
- নমুনা সংগ্রহের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
- ঘরোয়া pH কিট ব্যবহার করা যায় কি?
- মাটির pH প্রাকৃতিকভাবে ঠিক করার ৭টি কার্যকর উপায়
- মাটি অতিরিক্ত ক্ষারীয় হলে কী করবেন?
- প্রাকৃতিক কৃষিতে মাটির pH দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে স্থিতিশীল রাখবেন?
- দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ধরে রাখতে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তুলুন
- শেষ কথা: মাটির pH ঠিক করার আগে মাটিকে বুঝুন
জল বা দ্রবণ দিয়ে মাটি পাতলা করুন
মাটির pH পরিমাপ পদ্ধতিতে নমুনাটি পাতলা করার জন্য নিম্নলিখিত তিনটি তরলের
মধ্যে একটি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
জল:
পরিবাহিতা মান 0.2mS/m এর কম (25 ডিগ্রি C/77 ডিগ্রি ফারেনহাইট এ), pH মান 5.6 এর কম নয়
পটাসিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ: ঘনত্ব 1mol/L
ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ: ঘনত্ব 0.01mol/L
মাটির pH পরিমাপ পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহের জন্য স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে
উপযুক্ত পরিমাণে তাজা মাটি সংগ্রহ করুন এবং বায়ু শুকানোর জন্য এটি বাড়ির
ভিতরে রাখুন। অ্যাসিড, ক্ষার এবং অন্যান্য গ্যাসের পাশাপাশি ধুলো থেকে দূষণ রোধ
করতে নমুনাটি সরাসরি সূর্যালোক থেকে দূরে রাখতে হবে
নমুনা শুকানোর জন্য আপনি একটি শুকানোর চুলা ব্যবহার করতে পারেন। মনে রাখবেন যে
শুকানোর ওভেনের সেট গরম করার তাপমাত্রা 40 ডিগ্রি (104 ℉) এর বেশি হতে পারে না
কোয়ার্টারিং পদ্ধতি ব্যবহার করে উপযুক্ত পরিমাণে নমুনা বের করুন, মাটির বাইরের
অমেধ্য অপসারণ করুন এবং একটি 0.84 মিমি ছিদ্র আকারের পরীক্ষা চালনী দিয়ে
ফিল্টার করুন
নমুনা প্রস্তুতি
আন্তর্জাতিক মান: একটি 100ml পাত্রে নমুনার 10g (± 0.1g) ওজন করুন, 50ml জল (বা
দ্রবণ) যোগ করুন, 60 মিনিটের জন্য নাড়ুন, এবং তারপর 1 থেকে 3 ঘন্টা দাঁড়াতে
দিন।
পিএইচ পরিমাপঃ
মাটির pH পরিমাপ করার আগে, আপনাকে যন্ত্রটি ক্রমাঙ্কন করতে হবে। ক্রমাঙ্কনের
পরে, প্রস্তুতকৃত মাটির সাসপেনশনটি মিক্সারে রাখুন এবং মিশ্রণ ফাংশনটি সক্রিয়
করুন
একই সময়ে নমুনা দ্রবণে pH ইলেক্ট্রোড (তাপমাত্রা অনুসন্ধানের সাথে) নিমজ্জিত
করুন, পরিমাপ করা মান স্থিতিশীল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন এবং তারপর মানটি
রেকর্ড করুন।
আপনার জমিতে নিয়মিত সার দেওয়া হচ্ছে, সেচের ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু গাছের পাতা
হলুদ হয়ে যাচ্ছে, শিকড় ভালোভাবে বাড়ছে না কিংবা সার প্রয়োগের পরও আশানুরূপ ফলন
পাওয়া যাচ্ছে না? অনেক সময় কৃষক এসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে আরও বেশি সার
ব্যবহার করেন। অথচ সমস্যার পেছনে মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্বের ভারসাম্যহীনতা
থাকতে পারে।
মাটির pH প্রাকৃতিকভাবে ঠিক করার উপায় জানা থাকলে জমিতে অপ্রয়োজনীয় উপকরণ
প্রয়োগের ঝুঁকি কমানো এবং ফসলের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সহজ হয়। তবে এখানে একটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে: মাটির pH সব সময় বাড়াতে হবে, এমন নয়। কোনো জমি অতিরিক্ত
অম্লীয় হলে pH বাড়ানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। আবার মাটি অতিরিক্ত ক্ষারীয়
হলে সমস্যার ধরন বুঝে আলাদা ব্যবস্থা নিতে হয়।
মাটির pH হলো মাটির দ্রবণের অম্লতা বা ক্ষারত্ব বোঝানোর একটি পরিমাপ। এটি
মাটিতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা, শিকড়ের বৃদ্ধি এবং মাটির
জীবপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে জমিতে কী উপাদান প্রয়োগ করা উচিত, তা
নির্ধারণের আগে মাটির অবস্থা বোঝা জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষিজমিতে মাটির ধরন, অতিবৃষ্টি, পানি নিষ্কাশন, সেচের পানির গুণমান
এবং দীর্ঘদিনের কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে pH-এর পার্থক্য দেখা যেতে পারে। তাই
অন্য কৃষকের জমিতে যে পদ্ধতি কাজ করেছে, আপনার জমিতেও সেটি একই ফল দেবে—এমন
নিশ্চয়তা নেই।
এই গাইডে মাটির pH বোঝার উপায়, অম্লীয় মাটির ব্যবস্থাপনা, ক্ষারীয় মাটিতে করণীয়
এবং প্রাকৃতিক কৃষিতে মাটির স্বাস্থ্য ধরে রাখার বাস্তবসম্মত কৌশল আলোচনা করা
হয়েছে।
মাটির pH কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মাটির pH সাধারণত ০ থেকে ১৪-এর একটি স্কেলে প্রকাশ করা হয়। pH ৭-কে নিরপেক্ষ
বলা হয়। এর নিচের মান অম্লীয় এবং এর ওপরের মান ক্ষারীয় পরিবেশ নির্দেশ করে।
বাস্তব কৃষিজমিতে অধিকাংশ মাটির pH এই স্কেলের মাঝামাঝি অংশে থাকে।
তবে শুধু pH-এর একটি সংখ্যা দেখে মাটির সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য বোঝা যায় না। মাটিতে
পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ, জৈব পদার্থ, লবণাক্ততা, পানি নিষ্কাশন এবং মাটির গঠনও
গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সাধারণ কৃষিফসল প্রায় ৬ থেকে ৭-এর কাছাকাছি pH-তে ভালোভাবে পুষ্টি গ্রহণ
করতে পারে। কিন্তু এটি কোনো সর্বজনীন নিয়ম নয়। ফসলভেদে উপযুক্ত pH আলাদা। ধান,
চা, আনারস, বিভিন্ন ডালজাতীয় ফসল এবং সবজির চাহিদা এক নয়। তাই জমির pH ঠিক করার
সময় কোন ফসল চাষ করা হবে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
মাটির pH কম হলে কী হতে পারে?
অতিরিক্ত অম্লীয় মাটিতে কিছু পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদের জন্য কম সহজলভ্য হতে পারে,
আবার অ্যালুমিনিয়াম বা ম্যাঙ্গানিজের মতো কিছু উপাদান ক্ষতিকর মাত্রায় সহজলভ্য
হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে শিকড়ের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং গাছের পুষ্টি গ্রহণে
সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, pH ৫.৫-এর নিচে থাকা অনেক মাটিতে অম্লতার সঙ্গে সম্পর্কিত
পুষ্টির ঘাটতি বা বিষক্রিয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে শুধু এই মানের
ভিত্তিতে প্রতিটি জমির জন্য একই ব্যবস্থা নির্ধারণ করা যায় না।
মাটির pH বেশি হলে কী সমস্যা হয়?
অতিরিক্ত ক্ষারীয় মাটিতে লোহা, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ ও কিছু অন্যান্য পুষ্টি
উপাদান গাছের জন্য কম সহজলভ্য হতে পারে। ফলে পুষ্টির অভাবের মতো লক্ষণ দেখা
দিতে পারে, যদিও মাটিতে সংশ্লিষ্ট উপাদান কিছু পরিমাণে উপস্থিত থাকে।
ক্ষারীয় মাটির সমস্যার সঙ্গে কখনো কখনো সোডিয়ামের আধিক্য, খারাপ পানি নিষ্কাশন
বা সেচের পানির গুণমানও যুক্ত থাকে। এ ধরনের জমিতে শুধু কম্পোস্ট বা কৃষি চুন
ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
মাটির pH কীভাবে পরীক্ষা করবেন?
মাটির pH ঠিক করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শুরু হলো পরীক্ষা। পরীক্ষা ছাড়া জমি
অম্লীয় নাকি ক্ষারীয়, তা অনুমান করে কোনো সংশোধনী উপাদান প্রয়োগ করা
ঝুঁকিপূর্ণ।
মাটি পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠান
সম্ভব হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়, স্বীকৃত মাটি পরীক্ষাগার বা
উপযুক্ত কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করান।
নমুনা সংগ্রহের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
- একই ধরনের জমির বিভিন্ন স্থান থেকে অল্প অল্প মাটি সংগ্রহ করুন।
- জমির উপরিভাগের আবর্জনা সরিয়ে নির্ধারিত গভীরতা থেকে নমুনা নিন।
- যেখানে গোবর বা সার স্তূপ করে রাখা হয়েছিল, সেই জায়গা এড়িয়ে চলুন।
- আলাদা ধরনের জমি, নিচু অংশ বা সমস্যাযুক্ত অঞ্চল থেকে নমুনা আলাদা রাখুন।
- পরীক্ষাগারের নির্দেশনা অনুযায়ী নমুনা মিশিয়ে ও প্যাকেটজাত করে পাঠান।
সব জমির জন্য একই নমুনা সংগ্রহের গভীরতা উপযুক্ত নয়। তাই পরীক্ষাগার বা কৃষি
কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো।
ঘরোয়া pH কিট ব্যবহার করা যায় কি?
উপযুক্ত মানের pH কিট বা মিটার দিয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে
যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন, নমুনা প্রস্তুতি, পানি ও মাটির অনুপাত এবং ব্যবহারের
নিয়ম ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
সস্তা বা নিম্নমানের পরীক্ষক দিয়ে পাওয়া একটি সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বড় জমিতে
চুন বা অন্য সংশোধনী প্রয়োগ করবেন না। pH-এর সঙ্গে মাটির বাফারিং ক্ষমতা ও
অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাগারে মাটি পরীক্ষা করলে সংশোধনী
উপাদানের প্রয়োজন নির্ধারণে আরও সহায়তা পাওয়া যায়।
মাটির pH প্রাকৃতিকভাবে ঠিক করার ৭টি কার্যকর উপায়
১. মাটিতে নিয়মিত পরিপক্ব কম্পোস্ট যোগ করুন
পরিপক্ব কম্পোস্ট মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে এবং মাটির গঠন, পানি ধারণ ও পুষ্টি
চক্র উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। জৈব পদার্থ মাটির রাসায়নিক পরিবর্তনের
বিরুদ্ধে কিছুটা বাফারিং ক্ষমতাও প্রদান করে।
তবে কম্পোস্টকে pH সংশোধনের নিশ্চিত ও দ্রুত সমাধান ভাবা ঠিক নয়। এর প্রভাব
নির্ভর করে কম্পোস্টের উপাদান, পরিপক্বতা, প্রয়োগের পরিমাণ এবং মাটির প্রাথমিক
অবস্থার ওপর।
কম্পোস্ট ব্যবহারের সময়:
- পরিষ্কার ও উপযুক্ত জৈব উপাদান ব্যবহার করুন।
- অপরিপক্ব বা দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য সরাসরি জমিতে প্রয়োগ এড়িয়ে চলুন।
- অতিরিক্ত প্রয়োগ করে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট করবেন না।
- মাটির পরীক্ষার ফল ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করুন।
জৈব পদার্থ বাড়ানো মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ
অংশ। কিন্তু অতিরিক্ত অম্লীয় জমির জন্য পরীক্ষায় কৃষি চুনের প্রয়োজন দেখা গেলে
শুধু কম্পোস্টের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নাও হতে পারে।
২. অম্লীয় মাটিতে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি চুন ব্যবহার করুন
মাটির pH কম হলে এবং পরীক্ষায় চুনের প্রয়োজন দেখা গেলে কৃষি চুন বা উপযুক্ত
চুনজাতীয় উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে। কৃষি চুন সাধারণত ক্যালসিয়াম
কার্বোনেটভিত্তিক হয়। ডলোমাইটজাতীয় উপাদানে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি
ম্যাগনেসিয়ামও থাকে।
কৃষি চুন মাটির অম্লতা কমাতে এবং নির্দিষ্ট পুষ্টি সমস্যার সমাধানে সাহায্য
করতে পারে। কিন্তু কতটুকু চুন প্রয়োজন, তা মাটির pH-এর পাশাপাশি মাটির ধরন,
বাফারিং ক্ষমতা, চুনের গুণমান ও ফসলের লক্ষ্যমাত্রার ওপর নির্ভর করে।
তাই কোনো জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ চুন ব্যবহার করা হয়েছে বলে একই পরিমাণ আপনার
জমিতে প্রয়োগ করবেন না। পরীক্ষাগারের সুপারিশ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করুন।
সতর্কতা:
কৃষি চুন, পোড়া চুন ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত চুন এক জিনিস নয়। অনুপযুক্ত
চুনজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করলে গাছের ক্ষতি হতে পারে। চুন প্রয়োগের পরও মাটির pH
পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন, কারণ অতিরিক্ত চুন প্রয়োগে কিছু পুষ্টি উপাদানের
সহজলভ্যতা কমে যেতে পারে।
৩. ফসলের অবশিষ্টাংশ ও মালচিং কাজে লাগান
ধানের খড়, সুস্থ গাছের পাতা এবং অন্যান্য উপযুক্ত ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটির ওপর
রেখে দিলে তা মালচ হিসেবে কাজ করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব উপাদান পচে মাটিতে
জৈব পদার্থ যোগ করে।
মালচিং সরাসরি সব ধরনের মাটির pH নির্দিষ্ট মানে নিয়ে যায় না। এর প্রধান সুবিধা
হলো মাটির আর্দ্রতা রক্ষা, বৃষ্টির আঘাত কমানো, মাটির তাপমাত্রার ওঠানামা
নিয়ন্ত্রণ এবং জৈব পদার্থের সরবরাহে সহায়তা করা।
ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর পরিবর্তে নিরাপদভাবে কাজে লাগানো গেলে জমির সম্পদ
জমিতেই ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে রোগাক্রান্ত গাছের অংশ বা পোকামাকড়ের
আশ্রয়স্থল হতে পারে এমন উপাদান যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
৪. সঠিক ফসল নির্বাচন করুন
সব ফসল একই pH-তে সমানভাবে ভালো জন্মায় না। কোনো কোনো ফসল অম্লীয় পরিবেশে
তুলনামূলক ভালো মানিয়ে নিতে পারে, আবার অন্য ফসলের জন্য pH সংশোধন প্রয়োজন হতে
পারে।
আপনার জমির pH পরিবর্তন করা ব্যয়বহুল বা কঠিন হলে স্থানীয় পরিবেশে মানানসই ফসল
নির্বাচন একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল হতে পারে। তবে ফসলের বাজার, মৌসুমি
পানি, পুষ্টির চাহিদা এবং রোগ-পোকার ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে।
শুধু জমির pH কম বলে সব জমিতে একই ফসল লাগানো কিংবা pH বেশি বলে কৃষি উৎপাদন
বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাটি পরীক্ষা ও স্থানীয় কৃষি পরামর্শের ভিত্তিতে
সিদ্ধান্ত নিন।
৫. জমির পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নত করুন
মাটির pH-এর সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জলাবদ্ধ
বা বিশেষ ধরনের সালফাইডযুক্ত মাটিতে পানি বের করে দেওয়া কিংবা জমি শুকিয়ে ফেলার
ফলে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এতে অম্লতা দ্রুত বেড়ে যেতে
পারে।
এ কারণে কোনো জমিতে পানি জমে থাকলেই দ্রুত সব পানি বের করে দেওয়া উচিত—এমন নয়।
জমির ধরন, ফসল এবং মাটির বৈশিষ্ট্য বুঝে পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
সেচের পানির গুণমানও গুরুত্বপূর্ণ। পানিতে অতিরিক্ত লবণ বা বাইকার্বোনেট থাকলে
দীর্ঘমেয়াদে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে প্রভাব পড়তে পারে। সমস্যা সন্দেহ হলে
শুধু মাটি নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের পানিও পরীক্ষা করান।
৬. জৈব পদার্থ ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য বজায় রাখুন
একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে উপযুক্ত শস্য পর্যায়ক্রম অনুসরণ করা যেতে
পারে। কভার ক্রপ, ডালজাতীয় ফসল এবং বিভিন্ন ধরনের শিকড়বিশিষ্ট উদ্ভিদ জমিতে জৈব
পদার্থের উৎস বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
জৈব পদার্থ মাটির বাফারিং ক্ষমতায় ভূমিকা রাখে। এর অর্থ, মাটিতে সামান্য অম্লীয়
বা ক্ষারীয় উপাদান যোগ হলেই pH দ্রুত অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে যাবে—এমন নয়।
তবে জৈব পদার্থের প্রভাব ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং মাটির ধরন অনুযায়ী আলাদা হতে
পারে। তাই pH সংশোধনের প্রয়োজন থাকলে জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি
পরীক্ষায় নির্দেশিত অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭. অতিরিক্ত ছাই বা ঘরোয়া উপাদান ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
অনেক কৃষক কাঠের ছাই, চুন, ডিমের খোসা বা অন্যান্য ঘরোয়া উপাদান দিয়ে মাটির pH
ঠিক করার চেষ্টা করেন। কিছু উপাদানে ক্ষারীয় যৌগ বা ক্যালসিয়াম থাকতে পারে,
কিন্তু সেগুলোর রাসায়নিক গঠন ও কার্যকারিতা এক রকম নয়।
বিশেষ করে কাঠের ছাইয়ের pH ও পুষ্টির পরিমাণ উৎসভেদে ভিন্ন হয়। অতিরিক্ত ছাই
ব্যবহার করলে মাটির pH অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে এবং লবণ বা পুষ্টির
ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
ডিমের খোসা ধীরে ভাঙে, তাই তা দিয়ে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে জমির pH সংশোধনের আশা
করা উচিত নয়। একইভাবে, পরীক্ষা ছাড়া লেবুর রস, ভিনেগার বা অন্য কোনো ঘরোয়া
পদার্থ জমিতে ঢেলে pH পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন না।
প্রাকৃতিক কৃষির অর্থ হলো স্থানীয় সম্পদ ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বিবেচনা করে
দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা করা—অনুমান করে যেকোনো উপাদান প্রয়োগ করা নয়।
মাটি অতিরিক্ত ক্ষারীয় হলে কী করবেন?
অম্লীয় মাটিতে কৃষি চুন ব্যবহারের কথা বলা হলেও ক্ষারীয় মাটিতে একই উপাদান
ব্যবহার করা উচিত নয়। মাটি যদি অতিরিক্ত ক্ষারীয় হয়, তাহলে প্রথমে বুঝতে হবে
সমস্যাটি শুধু pH বেশি হওয়ার কারণে, নাকি সোডিয়ামের আধিক্য, লবণাক্ততা কিংবা
সেচের পানির গুণমানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সব ক্ষারীয় মাটির চিকিৎসা একই নয়। কিছু সোডিক মাটিতে জিপসামসহ নির্দিষ্ট
সংশোধনী ও উপযুক্ত পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন হতে পারে। আবার শুধু pH বেশি দেখেই
জিপসাম প্রয়োগ করা সঠিক নয়।
সাধারণভাবে করণীয়:
- মাটির pH, লবণাক্ততা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করুন।
- সেচের পানির গুণমান সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে সেটিও পরীক্ষা করান।
- মাটির সমস্যার কারণ অনুযায়ী কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
- উপযুক্ত হলে পরিপক্ব জৈব পদার্থ ব্যবহার করুন।
- পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও ফসলের উপযোগিতা মূল্যায়ন করুন।
- পরীক্ষার সুপারিশ ছাড়া অ্যাসিড, সালফার বা শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগ করবেন না।
- ক্ষারীয় মাটিতে pH কমানোর জন্য সরাসরি কোনো ঘরোয়া অ্যাসিড ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। সঠিক সংশোধনী নির্ভর করে মাটির রাসায়নিক গঠন এবং সমস্যার প্রকৃত কারণের ওপর।
প্রাকৃতিক কৃষিতে মাটির pH দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে স্থিতিশীল রাখবেন?
মাটির pH একবার ঠিক করে ফেললেই তা সারাজীবন একই থাকবে, এমন নয়। বৃষ্টি, সেচ,
ফসলের পুষ্টি গ্রহণ, সার ব্যবস্থাপনা এবং মাটির রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে সময়ের
সঙ্গে pH পরিবর্তিত হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ধরে রাখতে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তুলুন:
নিয়মিত মাটি পরীক্ষা করুন:
মাটির সমস্যা বা ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার পরীক্ষা
করুন। অম্লীয় মাটির ক্ষেত্রে FAO সাধারণ ব্যবস্থাপনায় দুই থেকে তিন বছর অন্তর
পরীক্ষা করার কথা উল্লেখ করে; তবে আপনার জমির ঝুঁকি ও স্থানীয় নির্দেশনা অনুযায়ী
সময় নির্ধারণ করা উচিত।
জৈব পদার্থের সরবরাহ বজায় রাখুন:
উপযুক্ত কম্পোস্ট, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং মালচ মাটির জৈব পদার্থের
ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে।
সার ব্যবহারে ভারসাম্য রাখুন:
দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট ধরনের নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে কিছু মাটিতে অম্লতা
বাড়তে পারে। তাই মাটির পরীক্ষা ও ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সার ব্যবস্থাপনা করুন।
ফসল অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করুন:
প্রতিটি ফসলের জন্য একই pH লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন না। ফসলের প্রয়োজন এবং মাটির
বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।
পরিবর্তন লিখে রাখুন: কখন মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে, কী উপাদান প্রয়োগ করা হয়েছে
এবং ফসলের প্রতিক্রিয়া কী ছিল—এসব নথিবদ্ধ করুন। এতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ
হয়।
মাটির pH ব্যবস্থাপনা প্রাকৃতিক কৃষির একটি অংশ মাত্র। জমির স্বাস্থ্য উন্নত করতে
মাটির গঠন, জৈব পদার্থ, পুষ্টি চক্র, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ফসল নির্বাচন—সবকিছু
একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
পানির নির্যাসের pH 7 এর নিচে হলে
ক্রমাঙ্কনের সময়, স্ট্যান্ডার্ড বাফার দ্রবণের তাপমাত্রা নমুনা দ্রবণের
তাপমাত্রা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পৃথক হওয়া উচিত নয় এবং ত্রুটিটি 1 ডিগ্রি
সেন্টিগ্রেডের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
স্ক্রীন করা মাটির নমুনা খুব সূক্ষ্ম হওয়া উচিত নয়, কারণ এটি পরিমাপের ফলাফলকে
প্রভাবিত করবে।
কনফিগার করা নমুনা দ্রবণটি অবশ্যই পর্যাপ্ত সময়ের জন্য অবক্ষয় করবে, অন্যথায়
এটি pH ইলেক্ট্রোড ডিফিউশন স্তর এবং বিনামূল্যে দ্রবণের মধ্যে হাইড্রোজেন
আয়নগুলির বিতরণকে প্রভাবিত করবে।
যদি বর্তমান পানির নির্যাসের pH 7 এর নিচে হয়, তাহলে মাটির pH লবণের নির্যাস
দ্রবণ ব্যবহার করে নির্ধারণ করা উচিত, যা মাটির নমুনা প্রস্তুত করতে পটাসিয়াম
ক্লোরাইড বা ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয়।
যথার্থ বেঞ্চটপ পিএইচ মিটার
শেষ কথা: মাটির pH ঠিক করার আগে মাটিকে বুঝুন
মাটির pH ঠিক রাখা ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি কোনো একক
সংখ্যার খেলা নয়। কোন ফসল চাষ করছেন, মাটিতে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, কতটা জৈব
পদার্থ আছে এবং পানি কীভাবে চলাচল করছে—এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মাটি অম্লীয় হলে পরীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী কৃষি চুন ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে
পারে। জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, মালচিং এবং সঠিক ফসল নির্বাচনও দীর্ঘমেয়াদি মাটির
স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। আর মাটি ক্ষারীয় হলে সংশোধনী প্রয়োগের
আগে সমস্যার কারণ নির্ণয় করা আরও জরুরি।




গোল্ডেন প্লাস আইটি সেন্টারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url